দীর্ঘদিন পর তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে টানা কয়েক ঘণ্টা বৈঠক করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের বিশেষ বর্ধিত সভায় সারাদেশ থেকে তিন হাজারের বেশি তৃণমূলের নেতা ওই সভায় যোগ দেন। সেখানে কয়েক ডজন নেতার কথা মনোযোগ দেন শোনেন দলীয় প্রধান। তারা নিজেদের দাবি কিংবা অভিযোগ বিষয়ে সভাপতিকে অবগত করেন। সেখানে বিশেষ গুরুত্ব পায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টি।
তবে প্রধানমন্ত্রী সব অভিযোগ-অনুযোগ শুনে বিভেদ ভুলে টানা চতুর্থবারের মতো দলকে ক্ষমতায় আনার নির্দেশনা দিয়েছেন। দল যাকেই মনোনয়ন দেবে আগামী নির্বাচনে তাকে বিজয়ী করতে বলেছেন। দলীয় প্রধানের সঙ্গে এই বিশেষ বর্ধিত সভার ফলে কোন্দল অনেকটা কমে এসেছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতারা। তবে ভোটের আগে সেটা কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে কার কার।
গত রোববার (৬ আগস্ট) সকাল থেকে দিনব্যাপী ওই বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবনে। যেখানে আমন্ত্রণ পেয়ে যোগ দেন আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, জেলা/মহানগর ও উপজেলা/থানা/পৌর (জেলা সদরে অবস্থিত পৌরসভা) আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা ছাড়াও জাতীয় সংসদের দলীয় সদস্যবৃন্দ, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের দলীয় চেয়ারম্যানগণ এবং সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার দলীয় মেয়ররাসহ সহযোগী সংগঠনসমূহের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা।
সভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থাকলেও তাদের কাউকে বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হয়নি। শুধু বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এদিন উদ্বোধনী ও সমাপনী মিলিয়ে দুই দফায় প্রায় এক ঘণ্টা বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। অবশ্য এ সময় নিজেদের কথাগুলো দলীয় প্রধানের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পান তৃণমূলের ৪৩ জন নেতা। তারা তাদের ‘অভাব ও অভিযোগ’ তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে উঠে আসে স্থানীয় কোন্দলের বিষয়। আবার বিভাগীয় নেতারা নিজ নিজ বিভাগের সংসদীয় আসনে আসন্ন নির্বাচনে নৌকাকে বিজয়ী করার প্রতিশ্রুতিও জানান।
সম্প্রতি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সমাবেশে নিজেদের মধ্যেই সংঘাতে জড়াতে দেখা গেছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের। পাশাপাশি রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর এলাকার নেতাকর্মীদের মাঝেও কিছুদিন আগে সমাবেশের মধ্যেই হাতাহাতির ঘটনা দেখা গেছে।
এদিকে, কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই রাজধানীর গুলিস্তানে শান্তি সমাবেশ চলাকালে চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটাতে দেখা গেছে রূপগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে।
ঢাকা-২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য কামরুল ইসলাম এবং কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহিন আহমেদের মধ্যকার বিভেদও প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সমাবেশে এসে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেই চেয়ার ছোড়াছুড়ি করতে দেখা গেছে এই দুই পক্ষকে। এছাড়া গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগীয় শান্তি সমাবেশে এসে এই দুই পক্ষ সংঘাতে জড়ায়। সমাবেশ শেষে ফেরার পথে তাদের ছুরিকাঘাতে এক মাদরাসা ছাত্র মারাও গেছেন।LL3
শুধু রাজধানীই, ঢাকার বাইরেও আওয়ামী লীগের দুই পক্ষ, কোথাও আবার তিনটি পক্ষ দেখা গেছে। যাদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা যেন নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও এসব সংঘাত ও মনোমালিন্য অনেক আগেই কেন্দ্রের নজরে এসেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যকালে এসব বিষয়ে কথা বলেছেন।
তবে এবার খোদ আওয়ামী লীগ সভাপতির কাছে নিজেদের আভ্যন্তরীণ দূরত্বের বিষয়টি তুলে ধরা হলো। যদিও দলীয় প্রধান সবাইকে বিভেদ ভুলে একত্রিত হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হোক তাকে বিজয়ী করতে নির্দেশ দিয়েছেন দলীয় প্রধান।
কী বলছেন তৃণমূলের নেতারা
আওয়ামী লীগ সভাপতির সঙ্গে এই সভা তৃণমূলকে আরও সংগঠিত ও সক্রিয় করেছে বলে মনে করেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী কামাল। ঢাকা মেইলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, রোববারের সভায় তিনিও উপস্থিত ছিলেন। সভাটির মাধ্যমে তৃণমূল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের অবসান হয়েছে।
তৃণমূল আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মূল যেটা থিম ছিল- আমি যেখানেই যাকে মনোনয়নটা দেব, তার জন্য আপনাদের কাজ করতে হবে। নৌকার পক্ষে কাজ করতে হবে। নৌকার বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। সুশৃঙ্খল নির্বাচনে কাজ করতে হবে।’
একই কথা জানিয়েছেন সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম রাজীব। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘কয়েকজন তৃণমূল নেতা দলীয় সভাপতির কাছে স্থানীয় গ্রুপিং সংক্রান্ত কিছু বিষয় তুলে ধরেন। তবে কারও নাম উল্লেখ করেননি।’
মঞ্জুরুল আলম রাজীব বলেন, ‘আমার এখানে কোনো গ্রুপিং নেই। এ ধরনের কোনো অভিযোগও ওঠেনি। নেত্রী আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নির্দেশ আমাদের জন্য শিরোধার্য।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি এই সভার মাধ্যমে তৃণমূলকে কী বার্তা দিলেন জানতে চাইলে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম খোকন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জয়যুক্ত হতে হবে, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে কাজ করতে হবে, এটাই বার্তা আমাদের জন্য।’
অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়ে সভায় কী ধরনের নির্দেশনা পেলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দল তো তেমন নাই। যা আছে তাও থাকবে না, নেত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে।’
একই বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া সদর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু সুফিয়ান সফিক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘যেহেতু আমরা প্রায় সাড়ে ১৪ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায়, ক্ষমতায় থাকলে নিজেদের মধ্যে একটু মনমালিন্য, দুঃখ-বেদনা-অভিমান তৈরি হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার কথার মধ্যদিয়ে সেই বেদনা ভুলে যাওয়ার আহ্বান করেছেন। আমরা নেত্রীকে কথা দিয়েছি, সহল (সকল) অভিমান ভুলে গিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি যাকে জাতীয় মনোনয়ন দেবেন, তার পক্ষে কাজ করব।’