গত ১১ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে- এমন ভয়াবহ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির দাবি, এ সময়ের মধ্যে ৬৭ হাজার ৮৯০টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৬৫ হাজার ২১ জন। সড়কে এ ধরনের ধারাবাহিক প্রাণহানিকে তারা ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, এর দায় সরকারের দুর্নীতি, ভুলনীতি ও পরিবহন খাতের নৈরাজ্যের ওপর বর্তায়।
মঙ্গলবার (২১ রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী লিখিত বক্তব্যে বলেন, সড়ক নিরাপত্তা আজ জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় একজনের বেশি মানুষ সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন। ২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি ৯ হাজার ২২১ জন নিহত হন। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসেই দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৬ হাজার ২৩ জনের, আহত হয়েছেন ১১ হাজার ৭৬৪ জন।
দীর্ঘ ১১ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর হার গড়ে ১৫ শতাংশ ধরে হিসাব করলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
সংগঠনটির দাবি, স্বাধীনতার পর দাতা সংস্থার শর্তে বেপরোয়া সড়ক নির্মাণ, নৌ ও রেলপথকে অবহেলা, এবং সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে না তোলার ফলে আজ সড়কই হয়ে উঠেছে প্রাণঘাতী। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও লাইসেন্সবিহীন চালক, বেপরোয়া গতি, ত্রুটিপূর্ণ সড়কব্যবস্থা, চালকদের মাদক গ্রহণ এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি— সব মিলিয়ে দেশে ‘সড়ক নৈরাজ্য’ ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নীতিগত ব্যর্থতা চলেছে। পরিবর্তন এলেও নীতি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকায় দুর্ঘটনার লাগাম টানা যায়নি। তিনি অভিযোগ করেন, পরিবহন খাত এখন দুর্নীতিবাজ পুলিশ ও প্রভাবশালী মালিকদের হাতে জিম্মি।
সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু হলে এক বছরের মধ্যেই ঢাকা ও চট্টগ্রাম অচল হয়ে পড়বে। এর পরিবর্তে সরকারি উদ্যোগে পাতাল মেট্রোরেল ও ডিজিটাল লেনভিত্তিক বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালুর দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ১২ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে— সমন্বিত নৌ-রেল-সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ করা, ঢাকায় পাতাল মেট্রোরেল ও ডিজিটাল বিআরটি লেন চালু, চালকদের রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর, এবং সড়কে সাইক্লিস্ট ও পথচারীদের জন্য নিরাপদ লেন ও ফুটপাত নিশ্চিত করা।
সংগঠনটি মনে করে, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না আনলে যানজট, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো সম্ভব নয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সড়ক সেক্টরে কোনো উন্নয়ন টেকসই হবে না।