এডিস মশাবাহী ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ এবার বর্ষাকালে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে- সেই সতর্কতা আগেই দেওয়া হয়েছিল। বর্ষাকালের শুরু থেকেই সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে চলতি জুলাই মাসের শুরুতেই ভয়ংকর চেহারা ধারণ করেছে ডেঙ্গু।
চলতি মাসের প্রথম ১১ দিনেই প্রায় সাত হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বছরের প্রথম ছয় মাসের কাছাকাছি পরিমাণ রোগী শনাক্ত হয়েছে এই কয়েক দিনে। আর গত ১১ দিনে মৃত্যু হয়েছে ৩৬ জনের।
চলতি মাসের ১১ দিনে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছয় হাজার ৯১৯ জন। আর এই সময়ে মারা গেছেন ৩৬ জন। গত ১ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৮৩ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮৯৭ জন।
জুলাইয়ের শুরুর দিন থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুতে রেকর্ড সৃষ্টি করছে। সবশেষ মঙ্গলবার (১১ জুলাই) ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যু উভয়টিতে রেকর্ড করেছে। এদিন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন সাতজন আর আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৫৪ জন।
চলতি মাসের ১১ দিনে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছয় হাজার ৯১৯ জন। আর এই সময়ে মারা গেছেন ৩৬ জন। গত ১ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৮৩ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮৯৭ জন।
মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে নতুন করে আরও এক হাজার ৫৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৬২৮ জন ঢাকায় চিকিৎসাধীন। বাকি ৪২৬ জন রাজধানীর বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই সময়ে নতুন করে আরও সাতজন মারা গেছেন। ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ জনে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি জুলাইয়ের প্রথম দিন আক্রান্ত হন ২৭০ জন, মারা যান তিনজন। ২ জুলাই আক্রান্ত হন ৫০৯ জন আর মারা যান দুইজন। ৩ জুলাই আক্রান্ত ৪৩৬ জন আর মৃত্যু চারজন। ৪ জুলাই আক্রান্ত ৬৭৮ এবং মৃত্যু পাঁচজন। ৫ জুলাই আক্রান্ত ৫৮৪ এবং মৃত্যু একজন। ৬ জুলাই আক্রান্ত ৬৬১ জন আর মৃত্যু দুইজন। ৭ জুলাই আক্রান্ত ১৮২ জন এবং মৃত্যু একজন। ৮ জুলাই আক্রান্ত হয়েছেন ৮২০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে দুইজনের। ৯ জুলাই আক্রান্ত হয়েছেন ৮৩৬ জন আর মৃত্যু হয় ছয়জনের। ১০ জুলাই আক্রান্ত হন ৮৮৯ জন এবং মারা যান তিনজন। আর ১১ জুলাই আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৫৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে সাতজনের।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, ইতোমধ্যে দেশের ৬০ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, আগামী দিনগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। এজন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবার জটিল আকার ধারণ করতে পারে। মানুষ একই সঙ্গে ডেঙ্গুর একাধিক ধরনেও আক্রান্ত হচ্ছেন। পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতি হওয়ায় এবার ডেঙ্গুতে বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এজন্য সবাইকে সতর্ক থাকা এবং মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে আন্তরিক হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, ইতোমধ্যে দেশের ৬০ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, আগামী দিনগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। এজন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন জানান, আগামী কয়েক মাস ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তিনি বলেন, দেশে সাধারণত জুনের পর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। তাই আগামী দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেড়ে যেতে পারে। আর আক্রান্ত বেশি হলে মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে।
সম্প্রতি এক তথ্যবিবরণীতে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি হওয়ার পাশাপাশি দুটি লক্ষণ দেখা দিলে ডেঙ্গু সন্দেহে নিকটস্থ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। লক্ষণ দুটি হলো- তীব্র মাথা ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরের পেশি ও জয়েন্টসমূহে ব্যথা এবং বারবার বমি করার প্রবণতা।
তীব্র ডেঙ্গুর লক্ষণ সম্পর্কে জানিয়ে তথ্যবিবরণী বলা হয়েছে, ডেঙ্গু হওয়ার তিন থেকে সাত দিন এর তীব্র লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কমে যাওয়া, তীব্র পেট ব্যথা, ক্রমাগত বমি করা, বমির সঙ্গে রক্ত যাওয়া, ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া এবং শরীরে অবসাদ বোধ করা ও অস্থিরতা বোধ করা।
প্রতিবছর বর্ষাকালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। ওই সময়ে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১ সালে সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। ওই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া ২০২২ সালে ডেঙ্গু নিয়ে মোট ৬২ হাজার ৩৮২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে গত বছর মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে ২৮১ জন মারা গেছেন।