ঢাকা ১১:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

আলোর মুখ দেখছে না ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম

দেশের আওয়াজ ডেস্কঃ
  • আপডেট সময় : ০৭:০১:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ ৯৩ বার পড়া হয়েছে

ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা, রাখাইন, সাওতালসহ খাগড়াছড়িতে পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। মায়ের ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ ও পাঠদান তাদের দীর্ঘদিনের দাবি। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই ২০১৭ সাল থেকে স্ব-স্ব মাতৃভাষায় লেখাপড়ার দ্বার উন্মুক্ত হয়। সেই বছর থেকেই মাতৃভাষায় ছাপানো বই পাচ্ছে খাগড়াছড়ির চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা। যা সরবরাহ করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় পাঠদানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকটসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম। ফলে উদ্যোগেই আটকে আছে ক্ষুদ্র নৃ-গাষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ।K2

নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে ২০১৭ সালে স্ব-স্ব মাতৃভাষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হলেও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকায় সেভাবে আলোর মুখ দেখেনি এ কার্যক্রম। চলতি বছরের প্রথম দিনেই খাগড়াছড়িতে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাঝে স্ব-স্ব মাতৃভাষায় রচিত পাঠ্যপুস্তক তুলে দেওয়া হয়। নিজস্ব বর্ণমালার বই-খাতা পেয়ে উচ্ছ্বসিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এসব শিক্ষার্থী।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানায়, জেলায় ২০২৩ সালে মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৭০৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। যার মধ্যে সরকারি বিদ্যালয় ৩২১টি, জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয় সংখ্যা ২৫৮টি, পিটিআই সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংখ্যা ১১২টি। এসব বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিকের চাকমা ভাষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৪২৬ জন, মারমা ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ২৪৭৩ জন এবং ত্রিপুরা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩১৭৪ জন। সব মিলিয়ে প্রাক-প্রাথমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট ১০ হাজার ৭৩ জন। প্রথম শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় ৪১২৮ জন, মারমা ভাষায় ২৮৩৩ জন এবং ত্রিপুরা ভাষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫৯৩ জন। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট নয় হাজার ৫৫৪ জন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় চার হাজার ২৬৩ জন, মারমা ভাষায় দুই হাজার ২২৫ জন ও ত্রিপুরা ভাষায় তিন হাজার ৬২ জন। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয় হাজার ৫৫০ জন। এছাড়াও তৃতীয় শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় চার হাজার ৪৩, মারমা দুই হাজার ৪১৫ জন এবং ত্রিপুরা ভাষায় রয়েছে তিন হাজার ৮৫ জন শিক্ষার্থী। এ নিয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয় হাজার ৫৪৩ জন। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যেই স্ব-স্ব মাতৃভাষায় রচিত বই বিতরণ করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি সদরের দাতকুপ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অংসাউ মারমা বলেন, শিশুরা মায়ের মাতৃভাষা শুনে বড় হয়। স্কুলে বাংলা ভাষায় বললে তারা হা করে তাকিয়ে তাকে। কিছু বুঝতে পারে না। ২০১৭ সাল থেকে স্কুলে মাতৃভাষায় পড়ানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাঁচ-ছয় বছরেও এই কার্যক্রমের উন্নতি হয়নি। তারমধ্যে শিক্ষক ও শ্রেনিকক্ষ সংকটও রয়েছে।

অংসাউ মারমা আরও বলেন, মারমা অদর্শিত এলাকায় মারমা শিক্ষক, চাকমা অদর্শিত এলাকায় চাকমা শিক্ষক দেওয়া প্রয়োজন। তাহলে কিছু সুফল পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া পৌর এলাকার অবিভাবকরা মাতৃভাষায় আন্তরিকতার অভাব দেখায়।

খাগড়াছড়ি শহরের দক্ষিণ খবং পড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিজয়া খীসা বলেন, ২০১৭ সাল থেকে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার বই পর্যায়ক্রমে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই বিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত মাতৃভাষার ওপর কোনো শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। সেজন্য এ বিদ্যালয়ে মাতৃভাষা সম্পর্কে অদক্ষতা রয়ে গেছে। আমরা নিজেদের প্রচেষ্টায় কিছু কিছু লেখালেখি শিখছি।

মাটিরাঙ্গা উপজেলার মাটিরাঙ্গা বড়ঝালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা রিনা ত্রিপুরা বলেন, এই বিদ্যালয়ে ত্রিপুরা, চাকমা ও বাঙালি শিক্ষার্থী আছে। চাকমা ভাষায় যদি আমাকে বলা হয় পড়াতে হবে, তাহলে আমাকে চাকমা ভাষা ভালো করে ধারণ করতে হবে। আমি যদি নিজেই চাকমা ভাষা না পারি, তাহলে আমরা কী করে চাকমা ভাষায় শিক্ষার্থীদের পড়াবো। বাংলা, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার মধ্যে মিশ্রণ হয়ে গেছে। কোনটা আমার অরজিনাল শব্দ তা আমরা আস্তে আস্তে ভুলে যাচ্ছি। এই মুহুতে স্ব স্ব ভাষায় প্রশিক্ষণ দরকার।

সদর উপজেলার ঠাকুরছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিক দিপা ত্রিপুরা বলেন, ককবরকদের মধ্যে গোত্র আছে। বিভিন্ন গোত্রের শব্দ আলাদা হয়। নাইতং ভাষা, খালি ভাষা ও ফাতং ভাষায়ও লেখা আছে। এখানে এলাকাভিত্তিক সমস্যা হয়। শিক্ষার্থীদের পড়তে সমস্যা হয়। আমরা ভেঙে ভেঙে পড়ানোর চেষ্টা করছি, আবার বোর্ডে লিখেও দিচ্ছি। শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে বললে বোঝে।

নানা সংকটেও পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা মায়ের ভাষায় পড়ছে জানিয়ে খাগড়াছড়ির সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার বলছেন, জাবারাং কল্যাণ সমিতি নিজেদের উদ্যোগে স্ব স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রেও প্রতিটি স্কুলে এক বা দুইজনের বেশি শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়নি। যেখানে যে সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি সেখানে সে সম্প্রদায়ের শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

মাতৃভাষায় পাঠদান তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা হলেও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকায় পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সরকারের এ উদ্যোগটির কোনো সুফল পাচ্ছে না ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা, এমনটাই মনে করছেন পাহাড়ের সচেতন নাগরিক সমাজ। তাদের মতে প্রশিক্ষিত শিক্ষক সংকটের ফলে এ শিক্ষা কার্যক্রম শিশুদের জন্য বোঝা হতে পারে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়, ১৯৮৫ সালে স্বল্প পরিসরে এ কার্যক্রম শুরু হলেও এখন তা বৃহৎ আকারে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইউনিসেফের সহায়তায় সরকারি অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান প্রকল্পের আওতায় খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পাড়া কেন্দ্রে ২১ হাজার ৭৯০ জন শিশু মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভ করছে। তিন পার্বত্য জেলায় এ সংখ্যা ৬১ হাজারের ওপরে।

এদিকে সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে টিকিয়ে রাখতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন পাড়া কেন্দ্রের শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদান করানো হচ্ছে। টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান প্রকল্পের আওতায় তিন থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলাও পড়ানো হচ্ছে। যাতে প্রাথমিকের পাঠদান পদ্ধতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারে শিক্ষার্থীরা।

খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শিলা তালুকদার বলেন, মাতৃভাষার সংকট এবং সমাধানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। নিজে চর্চা করবে পাশাপাশি তারা শিক্ষার্থীদেরও এই মাতৃভাষা পরিচয় করানোর জন্য কাজ করবে। এভাবে যদি সবার মধ্যে নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ তারা জাগিয়ে দিতে পারে তাহলে আমাদের যে সংকট আছে সেইগুলো সহজেই নিরসন হতে পারে বলে আমি মনে করি।

এই শিক্ষক বলেন, মারমা অদর্শিত এলাকায় মারমা শিক্ষক পদায়ন করা, চাকমা অদর্শিত এলাকায় চাকমা শিক্ষক পদায়ন করা দরকার। আমাদের এখানে সেই রকম নেই। বেশির ভাগই মিশ্র।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করলে এই কার্যক্রম আরো দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।

জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এন.সি. টি. বি) চাকমা ভাষার প্যানেল সদস্য আর্য মিত্র চাকমা ঢাকা মেইলকে বলেন, পাহাড়িদের ভাষা ছাড়া বাংলা শিখতে গেলে ছেলে-মেয়েদের অনেক সমস্যা হয়। তাদের অনেক শব্দ বুঝতে সমস্যা হয়। অনেক বিষয় তাদের মাতৃভাষায় যেটুকু বুঝতে পারে, বাংলা ভাষা তেমন বুঝতে পারে না। ইংরেজিতে এই সমস্যা আরও বেশি। তাই মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের শিক্ষাক্রম অত্যন্ত জরুরি।

সদর উপজেলার রিসোর্স সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর রিন্টু কুমার চাকমা ঢাকা মেইলকে বলেন, মাতৃভাষার বইগুলো ২০১৭ সাল থেকে জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এন.সি. টি. বি) দিচ্ছে। ত্রিপুরা ককবরক ছাড়া মারমা এবং চাকমা ভাষায় পড়ানোর মতো প্রশিক্ষিত শিক্ষক আমাদের এই দুইটি গোষ্ঠীতে নেই। আমাদের অধিদফতর থেকে যে ধরনের রুটিন দেওয়া হয় সেই রুটিনে বাংলা, ইংরেজি বই পড়ার মতো রুটিন দেওয়া হয়। চাকামা, মারমা ও ত্রিপুরাদের মাতৃভাষায় বই ছাপা এবং সেগুলো পড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো দিকনির্দেশনা অধিদফতর থেকে দেওয়া হয় না। সেই জন্য আমাদের শিক্ষকরা এটা নিয়ে এত মাথা ঘামায় না। বইগুলো ছাপা হচ্ছে, শিশুদের কাছে যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলো ছবির মতো দেখা ছাড়া কোনো কাজে আসছে না।

এই কর্মকর্তা বলেন, জেলা পরিষদ এই ব্যাপারে স্ব-উদ্যোগী হয়ে মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের সাথে যোগাযোগ করে এটার খুব দ্রুত সমাধান করা উচিত। ২০১৭ আজ ছয় বছর হয়েছে ইনক্রিমেন্ট শুরু করতে পারিনি। কোনোভাবেই ইনক্রিমেন্ট হচ্ছে না। এভাবেই রয়ে গেছে।

খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বোধি সত্ত্ব দেওয়ান ঢাকা মেইলকে বলেন, ২০১০ সালের শিক্ষা নীতিতেই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের নিজ ভাষায় পড়াশোনা করার সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষক এবং পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। সেই আলোকেই সম্প্রতি পাঁচটি ভাষার ওপর বই সরবারহ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক না থাকাতেই স্কুলে মাতৃভাষায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য শিক্ষক সংকট সমাধান না হলে এবং এই সমস্যা দূর করা না হলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার উপর পাঠদান যথাযথভাবে হবে না বলে আমি মনে করি।

বোধি সত্ত্ব দেওয়ান আরও বলেন, জেলা পরিষদ থেকে এক মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে কি পাঠাদান করতে পারবে?

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. সাহাব উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, খাগড়াছড়ি জেলায় চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এই তিন সম্প্রদায়ের লোকজন মূলত বাস করেন। সরকার ২০১৭ সাল থেকে মাতৃভাষার উপরে বই চালু করেছে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। এখানে শিক্ষকদের ভাষাগুলোর ব্যাপরে সমস্যা আছে। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে, তারা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।

বড় সমস্যা হচ্ছে একটি বিদ্যালয় এলাকায় এক সম্প্রদায়ের লোকজন বাস করলেও সেখানকার শিক্ষকরা অন্য সম্প্রদায়ের। সেই ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। আমরা যখন শিক্ষকদের বদলি করি সেই ক্ষেত্রে চেষ্টা করে থাকি ওই সম্প্রদায়ের শিক্ষক সেখানে যেন বদলি হয়। এছাড়া সামনে একটি নিয়োগ আছে, সেখানে জেলা পরিষদের সাথে আলোচনা করে যে এলাকার শিক্ষার্থীরা যে সম্প্রদায়ের সেই সম্প্রদায়ের শিক্ষক পদায়ন করার চেষ্টা করব। যাতে করে শিক্ষকরা শিশুদের সহজেই মাতৃভাষায় শিক্ষাদান করতে পারেন।

সাহাব উদ্দিন আরও বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে আমরা এই সংকটকে সহজেই সমাধান করার চেষ্টা করব।

এদিকে, যথাযথ উদ্যোগ ও কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া গেলে স্ব স্ব মাতৃভাষায় পাঠদানে আলোর দুয়ার খুলবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সুত্রঃ ঢাকা মেইল

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

আলোর মুখ দেখছে না ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম

আপডেট সময় : ০৭:০১:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা, রাখাইন, সাওতালসহ খাগড়াছড়িতে পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। মায়ের ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ ও পাঠদান তাদের দীর্ঘদিনের দাবি। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই ২০১৭ সাল থেকে স্ব-স্ব মাতৃভাষায় লেখাপড়ার দ্বার উন্মুক্ত হয়। সেই বছর থেকেই মাতৃভাষায় ছাপানো বই পাচ্ছে খাগড়াছড়ির চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা। যা সরবরাহ করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় পাঠদানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকটসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম। ফলে উদ্যোগেই আটকে আছে ক্ষুদ্র নৃ-গাষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ।K2

নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে ২০১৭ সালে স্ব-স্ব মাতৃভাষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হলেও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকায় সেভাবে আলোর মুখ দেখেনি এ কার্যক্রম। চলতি বছরের প্রথম দিনেই খাগড়াছড়িতে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাঝে স্ব-স্ব মাতৃভাষায় রচিত পাঠ্যপুস্তক তুলে দেওয়া হয়। নিজস্ব বর্ণমালার বই-খাতা পেয়ে উচ্ছ্বসিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এসব শিক্ষার্থী।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানায়, জেলায় ২০২৩ সালে মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৭০৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। যার মধ্যে সরকারি বিদ্যালয় ৩২১টি, জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয় সংখ্যা ২৫৮টি, পিটিআই সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংখ্যা ১১২টি। এসব বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিকের চাকমা ভাষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৪২৬ জন, মারমা ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ২৪৭৩ জন এবং ত্রিপুরা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩১৭৪ জন। সব মিলিয়ে প্রাক-প্রাথমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট ১০ হাজার ৭৩ জন। প্রথম শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় ৪১২৮ জন, মারমা ভাষায় ২৮৩৩ জন এবং ত্রিপুরা ভাষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫৯৩ জন। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট নয় হাজার ৫৫৪ জন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় চার হাজার ২৬৩ জন, মারমা ভাষায় দুই হাজার ২২৫ জন ও ত্রিপুরা ভাষায় তিন হাজার ৬২ জন। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয় হাজার ৫৫০ জন। এছাড়াও তৃতীয় শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় চার হাজার ৪৩, মারমা দুই হাজার ৪১৫ জন এবং ত্রিপুরা ভাষায় রয়েছে তিন হাজার ৮৫ জন শিক্ষার্থী। এ নিয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয় হাজার ৫৪৩ জন। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যেই স্ব-স্ব মাতৃভাষায় রচিত বই বিতরণ করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি সদরের দাতকুপ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অংসাউ মারমা বলেন, শিশুরা মায়ের মাতৃভাষা শুনে বড় হয়। স্কুলে বাংলা ভাষায় বললে তারা হা করে তাকিয়ে তাকে। কিছু বুঝতে পারে না। ২০১৭ সাল থেকে স্কুলে মাতৃভাষায় পড়ানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাঁচ-ছয় বছরেও এই কার্যক্রমের উন্নতি হয়নি। তারমধ্যে শিক্ষক ও শ্রেনিকক্ষ সংকটও রয়েছে।

অংসাউ মারমা আরও বলেন, মারমা অদর্শিত এলাকায় মারমা শিক্ষক, চাকমা অদর্শিত এলাকায় চাকমা শিক্ষক দেওয়া প্রয়োজন। তাহলে কিছু সুফল পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া পৌর এলাকার অবিভাবকরা মাতৃভাষায় আন্তরিকতার অভাব দেখায়।

খাগড়াছড়ি শহরের দক্ষিণ খবং পড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিজয়া খীসা বলেন, ২০১৭ সাল থেকে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার বই পর্যায়ক্রমে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই বিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত মাতৃভাষার ওপর কোনো শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। সেজন্য এ বিদ্যালয়ে মাতৃভাষা সম্পর্কে অদক্ষতা রয়ে গেছে। আমরা নিজেদের প্রচেষ্টায় কিছু কিছু লেখালেখি শিখছি।

মাটিরাঙ্গা উপজেলার মাটিরাঙ্গা বড়ঝালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা রিনা ত্রিপুরা বলেন, এই বিদ্যালয়ে ত্রিপুরা, চাকমা ও বাঙালি শিক্ষার্থী আছে। চাকমা ভাষায় যদি আমাকে বলা হয় পড়াতে হবে, তাহলে আমাকে চাকমা ভাষা ভালো করে ধারণ করতে হবে। আমি যদি নিজেই চাকমা ভাষা না পারি, তাহলে আমরা কী করে চাকমা ভাষায় শিক্ষার্থীদের পড়াবো। বাংলা, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার মধ্যে মিশ্রণ হয়ে গেছে। কোনটা আমার অরজিনাল শব্দ তা আমরা আস্তে আস্তে ভুলে যাচ্ছি। এই মুহুতে স্ব স্ব ভাষায় প্রশিক্ষণ দরকার।

সদর উপজেলার ঠাকুরছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিক দিপা ত্রিপুরা বলেন, ককবরকদের মধ্যে গোত্র আছে। বিভিন্ন গোত্রের শব্দ আলাদা হয়। নাইতং ভাষা, খালি ভাষা ও ফাতং ভাষায়ও লেখা আছে। এখানে এলাকাভিত্তিক সমস্যা হয়। শিক্ষার্থীদের পড়তে সমস্যা হয়। আমরা ভেঙে ভেঙে পড়ানোর চেষ্টা করছি, আবার বোর্ডে লিখেও দিচ্ছি। শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে বললে বোঝে।

নানা সংকটেও পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা মায়ের ভাষায় পড়ছে জানিয়ে খাগড়াছড়ির সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার বলছেন, জাবারাং কল্যাণ সমিতি নিজেদের উদ্যোগে স্ব স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রেও প্রতিটি স্কুলে এক বা দুইজনের বেশি শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়নি। যেখানে যে সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি সেখানে সে সম্প্রদায়ের শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

মাতৃভাষায় পাঠদান তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা হলেও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকায় পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সরকারের এ উদ্যোগটির কোনো সুফল পাচ্ছে না ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা, এমনটাই মনে করছেন পাহাড়ের সচেতন নাগরিক সমাজ। তাদের মতে প্রশিক্ষিত শিক্ষক সংকটের ফলে এ শিক্ষা কার্যক্রম শিশুদের জন্য বোঝা হতে পারে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়, ১৯৮৫ সালে স্বল্প পরিসরে এ কার্যক্রম শুরু হলেও এখন তা বৃহৎ আকারে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইউনিসেফের সহায়তায় সরকারি অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান প্রকল্পের আওতায় খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পাড়া কেন্দ্রে ২১ হাজার ৭৯০ জন শিশু মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভ করছে। তিন পার্বত্য জেলায় এ সংখ্যা ৬১ হাজারের ওপরে।

এদিকে সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে টিকিয়ে রাখতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন পাড়া কেন্দ্রের শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদান করানো হচ্ছে। টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান প্রকল্পের আওতায় তিন থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলাও পড়ানো হচ্ছে। যাতে প্রাথমিকের পাঠদান পদ্ধতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারে শিক্ষার্থীরা।

খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শিলা তালুকদার বলেন, মাতৃভাষার সংকট এবং সমাধানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। নিজে চর্চা করবে পাশাপাশি তারা শিক্ষার্থীদেরও এই মাতৃভাষা পরিচয় করানোর জন্য কাজ করবে। এভাবে যদি সবার মধ্যে নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ তারা জাগিয়ে দিতে পারে তাহলে আমাদের যে সংকট আছে সেইগুলো সহজেই নিরসন হতে পারে বলে আমি মনে করি।

এই শিক্ষক বলেন, মারমা অদর্শিত এলাকায় মারমা শিক্ষক পদায়ন করা, চাকমা অদর্শিত এলাকায় চাকমা শিক্ষক পদায়ন করা দরকার। আমাদের এখানে সেই রকম নেই। বেশির ভাগই মিশ্র।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করলে এই কার্যক্রম আরো দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।

জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এন.সি. টি. বি) চাকমা ভাষার প্যানেল সদস্য আর্য মিত্র চাকমা ঢাকা মেইলকে বলেন, পাহাড়িদের ভাষা ছাড়া বাংলা শিখতে গেলে ছেলে-মেয়েদের অনেক সমস্যা হয়। তাদের অনেক শব্দ বুঝতে সমস্যা হয়। অনেক বিষয় তাদের মাতৃভাষায় যেটুকু বুঝতে পারে, বাংলা ভাষা তেমন বুঝতে পারে না। ইংরেজিতে এই সমস্যা আরও বেশি। তাই মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের শিক্ষাক্রম অত্যন্ত জরুরি।

সদর উপজেলার রিসোর্স সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর রিন্টু কুমার চাকমা ঢাকা মেইলকে বলেন, মাতৃভাষার বইগুলো ২০১৭ সাল থেকে জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এন.সি. টি. বি) দিচ্ছে। ত্রিপুরা ককবরক ছাড়া মারমা এবং চাকমা ভাষায় পড়ানোর মতো প্রশিক্ষিত শিক্ষক আমাদের এই দুইটি গোষ্ঠীতে নেই। আমাদের অধিদফতর থেকে যে ধরনের রুটিন দেওয়া হয় সেই রুটিনে বাংলা, ইংরেজি বই পড়ার মতো রুটিন দেওয়া হয়। চাকামা, মারমা ও ত্রিপুরাদের মাতৃভাষায় বই ছাপা এবং সেগুলো পড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো দিকনির্দেশনা অধিদফতর থেকে দেওয়া হয় না। সেই জন্য আমাদের শিক্ষকরা এটা নিয়ে এত মাথা ঘামায় না। বইগুলো ছাপা হচ্ছে, শিশুদের কাছে যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলো ছবির মতো দেখা ছাড়া কোনো কাজে আসছে না।

এই কর্মকর্তা বলেন, জেলা পরিষদ এই ব্যাপারে স্ব-উদ্যোগী হয়ে মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের সাথে যোগাযোগ করে এটার খুব দ্রুত সমাধান করা উচিত। ২০১৭ আজ ছয় বছর হয়েছে ইনক্রিমেন্ট শুরু করতে পারিনি। কোনোভাবেই ইনক্রিমেন্ট হচ্ছে না। এভাবেই রয়ে গেছে।

খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বোধি সত্ত্ব দেওয়ান ঢাকা মেইলকে বলেন, ২০১০ সালের শিক্ষা নীতিতেই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের নিজ ভাষায় পড়াশোনা করার সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষক এবং পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। সেই আলোকেই সম্প্রতি পাঁচটি ভাষার ওপর বই সরবারহ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক না থাকাতেই স্কুলে মাতৃভাষায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য শিক্ষক সংকট সমাধান না হলে এবং এই সমস্যা দূর করা না হলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার উপর পাঠদান যথাযথভাবে হবে না বলে আমি মনে করি।

বোধি সত্ত্ব দেওয়ান আরও বলেন, জেলা পরিষদ থেকে এক মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে কি পাঠাদান করতে পারবে?

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. সাহাব উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, খাগড়াছড়ি জেলায় চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এই তিন সম্প্রদায়ের লোকজন মূলত বাস করেন। সরকার ২০১৭ সাল থেকে মাতৃভাষার উপরে বই চালু করেছে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। এখানে শিক্ষকদের ভাষাগুলোর ব্যাপরে সমস্যা আছে। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে, তারা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।

বড় সমস্যা হচ্ছে একটি বিদ্যালয় এলাকায় এক সম্প্রদায়ের লোকজন বাস করলেও সেখানকার শিক্ষকরা অন্য সম্প্রদায়ের। সেই ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। আমরা যখন শিক্ষকদের বদলি করি সেই ক্ষেত্রে চেষ্টা করে থাকি ওই সম্প্রদায়ের শিক্ষক সেখানে যেন বদলি হয়। এছাড়া সামনে একটি নিয়োগ আছে, সেখানে জেলা পরিষদের সাথে আলোচনা করে যে এলাকার শিক্ষার্থীরা যে সম্প্রদায়ের সেই সম্প্রদায়ের শিক্ষক পদায়ন করার চেষ্টা করব। যাতে করে শিক্ষকরা শিশুদের সহজেই মাতৃভাষায় শিক্ষাদান করতে পারেন।

সাহাব উদ্দিন আরও বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে আমরা এই সংকটকে সহজেই সমাধান করার চেষ্টা করব।

এদিকে, যথাযথ উদ্যোগ ও কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া গেলে স্ব স্ব মাতৃভাষায় পাঠদানে আলোর দুয়ার খুলবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সুত্রঃ ঢাকা মেইল