আবহাওয়া দপ্তর চলতি মাসের শেষে বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বললেও অদ্যাবধি উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টির দেখা নেই। ঋতুচক্রে (আষাঢ়-শ্রাবণ) বর্ষা ঋতু চললেও ভরা শ্রাবণেও নেই বৃষ্টি। চলছে খরা,মাঠ ফেটে চৌচির। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণে দেশের শষ্য ভান্ডার খ্যাত দিনাজপুরের কৃষকরা পড়েছে চরম বিপাকে। ইতোমধ্যে উপজেলার কৃষকদের আমন ক্ষেত রক্ষায় গভীর ও অগভীর নলক‚প চালুকরা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় স‚ত্রে জানা গেছে, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নসহ পৌরসভায় চলতি মৌসুমে ১৮ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমন রোপণ করা হয়েছে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৬ হাজার ৭১৮ টন। তবে বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষকেরা জমিতে হালচাষ করতে পারছেন না।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, আমন চাষিরা জমি তৈরি করছেন অনেক কষ্টে, তবে চারা রোপণে পর্যাপ্ত পানি নেই প্রায় জমিতে। কিছু কিছু জমিতে দেখা যাচ্ছে পানি, এসব জমিতে কৃষক চারা রোপণ করছেন। রোপনের পর কাঙ্খিত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ও প্রচন্ড দাবদাহে জমি ফেটে যাচ্ছে। অনেকেই বৃষ্টির পানির অপেক্ষায় আছেন। কেউ কেউ জমির পাশের ডোবা-নালা থেকে শ্যালো মেশিন দ্বারা পানি সেচ দিচ্ছেন।
খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের বারাইপাড়া গ্রামের কৃষক মকছেদ আলী বলেন, এক একর ২৫ শতক জমিতে আমন লাগিয়েছি কিন্তু পানির অভাবে ফসলের ক্ষেত ফেটে গেছে। এখন সেচ দিয়ে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছি। পানি না দিলে আমন ফসল টেকানো কঠিন হয়ে যাবে, ফলন হবে না। তার এই ফসল লাগাতে গত ১৫ দিনে ১৬ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। ডিজেলের দাম বেশি সেচ দিতে খরচ বেশি পড়ছে। লোকসান হলেও আবাদ না করে উপায় নেই।
আলাদীপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম জানান, এবার সাড়ে তিন একর জমিতে তিনি রোপা আমন চাষ করবেন। বৃষ্টি না থাকায় দুই একর জমিতে শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিয়ে লাগিয়েছেন। তিনি বলেন, পুরো শ্রাবণ মাস রোপা আমন চারা লাগানো যাবে, তবে কিছু ধানের জাত আছে দেরী করে লাগালে ফলন ভাল হবে না, তাই বাধ্য হয়ে সেচ দিয়ে লাগিয়েছি। এখান চারা লাগানোর পরও যদি বৃষ্টি না হয় তাহলে সেচ দিয়েই আবাদ করতে হবে। এতে খরচ বেড়ে যাবে।
এদিকে দিনাজপুর আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন জনান, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ১৩৯.৭ মিলিমিটার, দ্বিতীয় সপ্তাহে ১৬১ মিলিমিটার, তৃতীয় সপ্তাহে ৫.২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে একেবারেই কোন বৃষ্টিপাত হয়নি। প্রতিবছর এসময় বৃষ্টি হয়। তবে এবার কমবৃষ্টি প্রচন্ড গরমের কারণে যেভাবে পানি বাষ্পীয় হয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে ঠিক সেইভাবেই এমাসের শেষ দিকে বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে।
উপজেলার খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের মুক্তারপুর গ্রামের কৃষক আলম মাস্টার বলেন, অনাবৃষ্টির কারণে আমন চাষের আবাদ নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ফলে জমিতে সম্প‚রক সেচের মাধ্যমে আমন ধানের চারা রোপণ করতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়ে যাবে।
আলাদীপুর ইউনিয়নের মেলাবাড়ী গ্রামের কৃষক সুবাস চন্দ্র বলেন, এ বছর বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। তাই আমন ধান আবাদে অনেকটা সেচনির্ভর হতে হচ্ছে। শ্যালো মেশিন দিয়ে জমিতে সেচ এবং ট্রাক্টর দিয়ে চাষাবাদ করতে গিয়ে আমাদের খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে গত মঙ্গলবার (২৫.০৭.২৩) উপজেলা সেচ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আমন খেতে সেচ কার্যক্রমের জন্য উপজেলা সকল গভীর ও অগভীর নলক‚প চালু করার জন্য প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রুম্মান আক্তার বাংলা টাইমসকে বলেন, প্রচন্ডখরার কারণে কৃষকেরা জমিতে হালচাষ দিতে পারছেন না। সম্প‚রক সেচ চালু করতে ইতোমধ্যে বরেন্দ্রকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। উপজেলায় ইতিমধ্যে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন রোপণ শেষ হয়েছে। তবে আমন রোপণের এখনো যথেষ্ট সময় আছে। কারণ আমাদের এলাকায় সুগন্ধি ধান চাষ বেশি হয়, যা ব্রি ৩৪ জাতের। এই ধান লাগানো যাবে ২০ আগস্ট পর্যন্ত।