ঢাকা ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ব্যাংক ঋণে সুদহার বাড়লে কার লাভ কার ক্ষতি?

দেশের আওয়াজ ডেস্কঃ
  • আপডেট সময় : ১০:২৪:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ এপ্রিল ২০২৩ ৮১ বার পড়া হয়েছে

দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংক ঋণে সুদের হার চলমান রয়েছে ৬-৯ শতাংশে। সেখান থেকে সরে এবার সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যা কার্যকর হবে চলতি বছরের জুলাই থেকে। যদিও ব্যাংক ঋণে সুধের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। কিন্তু ভিন্ন সুর ব্যবসায়ীদের। তাদের মতে— বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে এ অবস্থায় কোনোভাবেই সুদের হার বাড়ানো উচিত হবে না বলে মনে করেন তারা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ার প্রভাব খুব বেশি প্রতীয়মান হবে দুটি ক্ষেত্রে। একটি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি এবং আরেকটি বিনিয়োগ। এই দুই ক্ষেত্রেই সুদের হার বাড়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

এর আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থা আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার সময়ও শর্ত হিসেবে সুদের হার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু দ্রব্যমূল্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবার পরেও সুদের হার বাড়ানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, বর্তমানে মুদ্রা বাজার পরিস্থিতির কারণে সুদের হারও ব্যাপকভাবে ওঠানামা করছে। ফলে নির্ধারিত সুদ হার দিয়ে মুদ্রা বাজারের সাথে তাল মেলাতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এজন্য সুদের হার পরিবর্তন করতে হচ্ছে।

‘মূল্যস্ফীতি কমবে’
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদের হার কম থাকলে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী হয়। ফলে কম সুদে ঋণ নিলে বাজারে অর্থের যোগান বাড়ে। কিন্তু ব্যাংকে আমানত বা সঞ্চয় বাড়ে না। ফলে দেখা দেয় মূল্যস্ফীতি। আর মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতেই সুদের হার বাড়ানো হয়, যাতে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ কম আগ্রহী হয় এবং বাজারে অর্থের যোগান কমে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে— গত ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২২ সালের অগাস্টে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। যা গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল।

এর আগে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর ও এর আগে মে মাসে রেপো সুদহার (যে হারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়) বাড়িয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এই মূল্যস্ফীতির কথা মাথায় রেখেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থার শর্ত সত্ত্বেও এতোদিন ব্যাংক ঋণের সুদের হার না বাড়িয়ে বরং তা ৯ শতাংশে নির্ধারিত করে রেখেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

জাহিদ হোসেন, একজন অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, সুদের হার বাড়লে তা আসলে পক্ষান্তরে মূল্যস্ফীতি কমাতে ভূমিকা রাখে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়লে ঋণের চাহিদা কমে। আর ঋণের চাহিদা কমে গেলে সামষ্টিকভাবে চাহিদা কমে। এ কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি মনে করেন— ব্যাংকে যদি পর্যাপ্ত ঋণের সুবিধা থাকে তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে। একই সাথে বাড়বে আমদানিও।

তার মতে— উদোক্তারা বেশি ঋণ পেলে সেই ঋণ বেশি বিনিয়োগ করে যন্ত্রপাতি, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, সিমেন্ট ও লোহার মতো কাঁচামাল আমদানির জন্য। ফলে এটি উৎপাদন ব্যবস্থাকে গতিশীল করে। আর সার্বিকভাবে উৎপাদন বাড়লে তা মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেয়।

বিনিয়োগে দ্বিমত
বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং দেশে মূল্যস্ফীতিও রয়েছে। গত ছয় মাসে ডলারের বিপরীতে টাকার ব্যাপক দরপতন হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা এই পরিস্থিতির ‘খেসারত’ দিচ্ছেন। এই অবস্থায় সুদের হার বাড়ানো হলে তাদের ব্যবসার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

ফজলুল হক, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি। তিনি বলেন, সব ধরনের ব্যবসায়িক দিক বিবেচনায় ফজলুল হক মনে করেন— এই সময়ে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।

এমন অবস্থায় ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়লে সেটি নতুন মাথাব্যথার কারণে হতে পারে এবং বিনিয়োগে স্বল্পমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেটাও নির্ভর করবে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এবং ব্যাংকের সাথে ঋণগ্রহীতার সম্পর্কের ওপর।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা আসলে প্রথমে ব্যাংকের চলমান খারাপ অবস্থার উন্নয়ন চান। এরপর ব্যাংকগুলো সিদ্ধান্ত নেবে যে তারা সুদের হার বাড়াতে চায় নাকি চায় না।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি মনে করেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদে কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বলেন, আমি মনে করতে পারি আমার কস্ট অব ডিপোজিট যে পর্যায়ে আছে আমি আর ইন্টারেস্ট বাড়াবো না, হতে পারে। আমি হয়তো মনে করতে পারি এই কাস্টমারকে দেব, এই কাস্টমারকে দেব না, হতে পারে।

সুদের হার বাড়লে সেটি বিনিয়োগের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা নিয়ে ইতিবাচক-নেতিবাচক দুই রকম যুক্তিই আছে। অনেক অর্থনীতিবিদ বলেন, সুদের হার বাড়লে যেসব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ঋণ গ্রহণ করেন তাদের বাণিজ্যিক ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদের হার যদি ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে রাখা হয়, তাহলে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণদানে আগ্রহ হারায়। কারণ এই খাতে ঋণ দিতে গেলে তাদের ব্যয় বেশি হয়, যা ৯ শতাংশ সুদ দিয়ে পোষানো যায় না।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এখন যদি এই দিকে ছাড় দেওয়া হয় যে ৯ শতাংশের বেশি সুদ নেওয়া যাবে সেক্ষেত্রে অনেকের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকসেস বা ঋণের সুযোগ বাড়তে পারে। আর তাই যদি ঘটে তাহলে কিন্তু বিনিয়োগের ওপর ইতিবাচক অর্থাৎ সুদের হার বাড়া সত্ত্বেও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনাই বেশি।

‘আমানত বাড়বে’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, এখন ব্যাংকগুলোর জন্য ডিপোজিট রেট বা আমানতের ওপর সুদের হার বেড়ে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ আছে। তাদের পক্ষে সুদের হার নির্ধারিত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে ব্যাংকগুলো নতুন করে কোনো বিনিয়োগে যেতে চাচ্ছে না।

তবে সুদের হার বাড়ানো হলে ব্যাংকগুলো আরও বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। একই সঙ্গে শিল্পক্ষেত্র তাদের পরিচালনার জন্য আরও বেশি মূলধন পাবে। এটা অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে— গত এক বছরে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা। আর একই সময়ে ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ৭২ লাখ কোটি টাকা। তার মানে হচ্ছে- ব্যাংক খাতে ঋণ যে হারে বেড়েছে সেই হারে আমানত বাড়েনি। ফলে তারল্য সংকটের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
তবে শুধু ঋণ বাড়ার কারণে নয় বরং, মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের আয় না বাড়ার কারণে গ্রাহকদের সঞ্চয় কমে যাওয়া আমানত কমার একটি বড় কারণ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, অনেকেই পুরনো সঞ্চয় ভেঙে খরচ করেছেন।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সুদের হার বাড়ানো হলে সেটি ব্যাংকের জন্য লাভজনক হবে। কারণ এর ফলে আমানতের সুদহারও বাড়বে বিধায় ব্যাংকের আমানত বা নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে।তিনি বলেন, সুদের হার ৯ শতাংশ রাখায় শুধু ব্যাংক নয় বরং আমানতকারীরাও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। লাভবান হচ্ছে ঋণগ্রহীতারা। তিনি মনে করেন, সুদের হার বাড়লে ডিপোজিট বা আমানত আর বাড়বে। একই সাথে ঋণের সুদের হার বেড়ে সেটি যদি বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তাহলে সেটি ব্যাংকখাতকে উজ্জীবিত করবে।

সূত্র: বিবিসি

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ব্যাংক ঋণে সুদহার বাড়লে কার লাভ কার ক্ষতি?

আপডেট সময় : ১০:২৪:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ এপ্রিল ২০২৩

দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংক ঋণে সুদের হার চলমান রয়েছে ৬-৯ শতাংশে। সেখান থেকে সরে এবার সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যা কার্যকর হবে চলতি বছরের জুলাই থেকে। যদিও ব্যাংক ঋণে সুধের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। কিন্তু ভিন্ন সুর ব্যবসায়ীদের। তাদের মতে— বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে এ অবস্থায় কোনোভাবেই সুদের হার বাড়ানো উচিত হবে না বলে মনে করেন তারা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ার প্রভাব খুব বেশি প্রতীয়মান হবে দুটি ক্ষেত্রে। একটি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি এবং আরেকটি বিনিয়োগ। এই দুই ক্ষেত্রেই সুদের হার বাড়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

এর আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থা আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার সময়ও শর্ত হিসেবে সুদের হার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু দ্রব্যমূল্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবার পরেও সুদের হার বাড়ানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, বর্তমানে মুদ্রা বাজার পরিস্থিতির কারণে সুদের হারও ব্যাপকভাবে ওঠানামা করছে। ফলে নির্ধারিত সুদ হার দিয়ে মুদ্রা বাজারের সাথে তাল মেলাতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এজন্য সুদের হার পরিবর্তন করতে হচ্ছে।

‘মূল্যস্ফীতি কমবে’
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদের হার কম থাকলে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী হয়। ফলে কম সুদে ঋণ নিলে বাজারে অর্থের যোগান বাড়ে। কিন্তু ব্যাংকে আমানত বা সঞ্চয় বাড়ে না। ফলে দেখা দেয় মূল্যস্ফীতি। আর মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতেই সুদের হার বাড়ানো হয়, যাতে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ কম আগ্রহী হয় এবং বাজারে অর্থের যোগান কমে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে— গত ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২২ সালের অগাস্টে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। যা গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল।

এর আগে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর ও এর আগে মে মাসে রেপো সুদহার (যে হারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়) বাড়িয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এই মূল্যস্ফীতির কথা মাথায় রেখেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থার শর্ত সত্ত্বেও এতোদিন ব্যাংক ঋণের সুদের হার না বাড়িয়ে বরং তা ৯ শতাংশে নির্ধারিত করে রেখেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

জাহিদ হোসেন, একজন অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, সুদের হার বাড়লে তা আসলে পক্ষান্তরে মূল্যস্ফীতি কমাতে ভূমিকা রাখে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়লে ঋণের চাহিদা কমে। আর ঋণের চাহিদা কমে গেলে সামষ্টিকভাবে চাহিদা কমে। এ কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি মনে করেন— ব্যাংকে যদি পর্যাপ্ত ঋণের সুবিধা থাকে তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে। একই সাথে বাড়বে আমদানিও।

তার মতে— উদোক্তারা বেশি ঋণ পেলে সেই ঋণ বেশি বিনিয়োগ করে যন্ত্রপাতি, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, সিমেন্ট ও লোহার মতো কাঁচামাল আমদানির জন্য। ফলে এটি উৎপাদন ব্যবস্থাকে গতিশীল করে। আর সার্বিকভাবে উৎপাদন বাড়লে তা মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেয়।

বিনিয়োগে দ্বিমত
বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং দেশে মূল্যস্ফীতিও রয়েছে। গত ছয় মাসে ডলারের বিপরীতে টাকার ব্যাপক দরপতন হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা এই পরিস্থিতির ‘খেসারত’ দিচ্ছেন। এই অবস্থায় সুদের হার বাড়ানো হলে তাদের ব্যবসার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

ফজলুল হক, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি। তিনি বলেন, সব ধরনের ব্যবসায়িক দিক বিবেচনায় ফজলুল হক মনে করেন— এই সময়ে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।

এমন অবস্থায় ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়লে সেটি নতুন মাথাব্যথার কারণে হতে পারে এবং বিনিয়োগে স্বল্পমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেটাও নির্ভর করবে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এবং ব্যাংকের সাথে ঋণগ্রহীতার সম্পর্কের ওপর।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা আসলে প্রথমে ব্যাংকের চলমান খারাপ অবস্থার উন্নয়ন চান। এরপর ব্যাংকগুলো সিদ্ধান্ত নেবে যে তারা সুদের হার বাড়াতে চায় নাকি চায় না।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি মনে করেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদে কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বলেন, আমি মনে করতে পারি আমার কস্ট অব ডিপোজিট যে পর্যায়ে আছে আমি আর ইন্টারেস্ট বাড়াবো না, হতে পারে। আমি হয়তো মনে করতে পারি এই কাস্টমারকে দেব, এই কাস্টমারকে দেব না, হতে পারে।

সুদের হার বাড়লে সেটি বিনিয়োগের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা নিয়ে ইতিবাচক-নেতিবাচক দুই রকম যুক্তিই আছে। অনেক অর্থনীতিবিদ বলেন, সুদের হার বাড়লে যেসব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ঋণ গ্রহণ করেন তাদের বাণিজ্যিক ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদের হার যদি ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে রাখা হয়, তাহলে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণদানে আগ্রহ হারায়। কারণ এই খাতে ঋণ দিতে গেলে তাদের ব্যয় বেশি হয়, যা ৯ শতাংশ সুদ দিয়ে পোষানো যায় না।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এখন যদি এই দিকে ছাড় দেওয়া হয় যে ৯ শতাংশের বেশি সুদ নেওয়া যাবে সেক্ষেত্রে অনেকের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকসেস বা ঋণের সুযোগ বাড়তে পারে। আর তাই যদি ঘটে তাহলে কিন্তু বিনিয়োগের ওপর ইতিবাচক অর্থাৎ সুদের হার বাড়া সত্ত্বেও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনাই বেশি।

‘আমানত বাড়বে’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, এখন ব্যাংকগুলোর জন্য ডিপোজিট রেট বা আমানতের ওপর সুদের হার বেড়ে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ আছে। তাদের পক্ষে সুদের হার নির্ধারিত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে ব্যাংকগুলো নতুন করে কোনো বিনিয়োগে যেতে চাচ্ছে না।

তবে সুদের হার বাড়ানো হলে ব্যাংকগুলো আরও বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। একই সঙ্গে শিল্পক্ষেত্র তাদের পরিচালনার জন্য আরও বেশি মূলধন পাবে। এটা অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে— গত এক বছরে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা। আর একই সময়ে ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ৭২ লাখ কোটি টাকা। তার মানে হচ্ছে- ব্যাংক খাতে ঋণ যে হারে বেড়েছে সেই হারে আমানত বাড়েনি। ফলে তারল্য সংকটের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
তবে শুধু ঋণ বাড়ার কারণে নয় বরং, মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের আয় না বাড়ার কারণে গ্রাহকদের সঞ্চয় কমে যাওয়া আমানত কমার একটি বড় কারণ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, অনেকেই পুরনো সঞ্চয় ভেঙে খরচ করেছেন।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সুদের হার বাড়ানো হলে সেটি ব্যাংকের জন্য লাভজনক হবে। কারণ এর ফলে আমানতের সুদহারও বাড়বে বিধায় ব্যাংকের আমানত বা নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে।তিনি বলেন, সুদের হার ৯ শতাংশ রাখায় শুধু ব্যাংক নয় বরং আমানতকারীরাও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। লাভবান হচ্ছে ঋণগ্রহীতারা। তিনি মনে করেন, সুদের হার বাড়লে ডিপোজিট বা আমানত আর বাড়বে। একই সাথে ঋণের সুদের হার বেড়ে সেটি যদি বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তাহলে সেটি ব্যাংকখাতকে উজ্জীবিত করবে।

সূত্র: বিবিসি