জ্বালানি সংকট, মূল্যবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে শুধু পরিবহণ ক্ষেত্রে নয়, দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি সাশ্রয়ের তাগিদ বাড়ছে। জার্মানির এক উদ্যোক্তা অভিনব উপায়ে সেই কাজে অবদান রাখছেন।
জার্মানির বাড়িঘরের ছাদের উপর বিপ্লব আসতে চলেছে। কর্নেলিউস পাউল একেবারে নতুন ধরনের টাইলস সৃষ্টি করেছেন, যেগুলো একই সঙ্গে সোলার মডিউলও বটে। তাছাড়া সাধারণ টালির মতো সেগুলো ভবনের সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।
সেই টাইলস দিয়ে অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। যতক্ষণ সূর্যের আলো থাকে, তত সময় ধরে এক পরিবারের চাহিদার তুলনায় বরং বেশি বিদ্যুৎ সৃষ্টি হয়। সোলার টাইলসের উদ্ভাবক কর্নেলিউস পাউল বলেন, ‘আমরা সহজ হিসেব করতে পারি। ছাদের উপর এক হাজার টাইলসের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দশ কিলোওয়াট। জার্মানির কোনো জায়গায় বছরে প্রায় ৯,০০০ কিলোওয়াট আওয়ার, কোথাও বা দশ হাজার কিলোওয়াট আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। অন্য বিষয়টি হলো, প্রায় ২০ বছরে সেই টাইলস কেনা ও বসানোর ব্যয় উঠে আসার কথা।’
পথিকৃত হিসেবে বিপ্লবীদের সব সময়ে সমস্যার মুখে পড়তে হয়। তার উদ্ভাবনী টাইলস উৎপাদনের জন্য এখনো হাতে করে অনেক কাজ করতে হয়। ফলে জার্মানির পূর্বাঞ্চলে নিজস্ব কারখানায় উৎপাদনের ব্যয়ও বেড়ে যায়।
আরেকটি বাধা হলো, তার নতুন পণ্যকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য হতে হবে, যাতে কয়েক দশক ধরে বিঘ্ন ছাড়াই টাইলস মজবুত থাকতে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। কর্নেলিউস বলেন, ‘সোলার মডিউল, তার উপরের সোলার ল্যামিনেট প্রথাগত প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়। এই শিল্পক্ষেত্র কোটি কোটি বার সেগুলো হাতেনাতে যাচাই করেছে। উপাদান হিসেবে পরীক্ষিত হওয়ায় আমার মনে কোনো দুশ্চিন্তা নেই।’
সম্প্রতি রোবটও কাজে লাগানো হচ্ছে। ফলে কর্নেলিউস আরও বেশি পরিমাণে এবং আরেও সস্তায় উৎপাদন করতে পারছেন। দামী সরঞ্জাম কেনার সামর্থ্য নিশ্চিত করতে তিনি বিনিয়োগকারীদের নিজের কোম্পানির অংশীদার করেছেন। এভাবে নতুন কোম্পানির প্রতি আস্থা আদায় করতে পেরেছেন তিনি।
কর্নেলিউস পাউল বলেন, ‘২০১১ সালে আমরা মাত্র তিন জনকে নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। এখন প্রায় ৭০ জন কর্মী সক্রিয় রয়েছেন। গত বছর আমাদের টার্নওভার দ্বিগুণ হয়ে ৫০ লাখ ছুঁয়েছে। চলতি বছর আমরা সেটা পাঁচ বা ছয় গুণ করতে চাই।’
জ্বালানি সংকটের কারণে জার্মানির অনেক বাসার মালিকের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদনের তাগিদ বাড়ছে। কর্নেলিউস সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন। সেইসঙ্গে সম্প্রতি এমন উদ্যোগের জন্য আরও মোটা অংকের রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে, যে ক্ষেত্রে বেশি জটিলতা ছাড়াই ভবনের রূপান্তর ঘটানো যায়। একটি ভবনের সংস্কারের বর্ণনা দিয়ে কর্নেলিউস বলেন, ‘ছাদে কয়েকটি জায়গায় গর্ত করা হচ্ছে। সেখান দিয়ে প্লাস ও মাইনাস কেবল ঢোকানো হবে। সেই তার কেবল চ্যানেলের মাধ্যমে সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যেখানে ইনভার্টার রয়েছে।
কোটি কোটি ইউরো অংকের বাজারে এই সটাইল বিপ্লবী’ এখনো ছোট আকারে ব্যবসা করছেন। তবে কোনো এক সময়ে তার সোলার টাইলস জার্মানিতে বড় আকারে বিক্রি হবে বলে তিনি নিশ্চিত। কর্নেলিউস পাউল মনে করেন, ‘জার্মানিতে দেড় কোটি এমন বাড়ি রয়েছে, যেখানে একটি বা দুটি পরিবার বাস করে এবং আগামী ৩০ বছরের মধ্যে যেগুলোর জ্বালানি কাঠামোর সংস্কার করতে হবে। হয়তো ছাদও খুব পুরানো হয়ে গেছে। সেই হিসেব অনুযায়ী বছরে প্রায় পাঁচ লাখ ছাদের সংস্কার, অর্থাৎ ২০ থেকে ৩০ কোটি সোলার টাইলস সেখানে লাগানো হতে পারে। আমরা সেই ধরনের কাজের মাধ্যমে সেক্ষেত্রে অবদান রাখার আশা করছি।’
জার্মানির মানুষ কিন্তু সাধারণত মূল্যের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। ফলে তাদের মন জয় করা কঠিন হবে। কিন্তু আপাতত যুগের হাওয়া তার জন্য সুবিধা বয়ে আনছে। টাইলসের কার্যকরিতা সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে সম্ভবত আরও ক্রেতা পাওয়া যাবে।
সূত্র: ডয়চে ভেলে